রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। এই ঘটনাকে মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "আইনে যতটুকু হার্ড (কঠোর) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাব। এবার আর কাউকে মাফ করে দেওয়া যায় না।"
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।
তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতির ভয়ংকর চিত্র
গত ২৭ মে ভোরে ঘটা ওই ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ৩ জুন জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি মোটেও হাসপাতাল পরিচালনার উপযোগী ছিল না। ৯০০ বর্গফুটের ওই বদ্ধ কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় ধরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) সচল ছিল না এবং কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশনও ছিল না। ফলে কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যায়—যা নবজাতকদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। এ ছাড়াও নবজাতকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।
রবিবারের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যে কক্ষটিতে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি ইতিমধ্যেই সিলগালা করা হয়েছে। তবে পুরো হাসপাতালে বর্তমানে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় হুট করে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আগামী দুই দিন সরকারি বন্ধের মধ্যে আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখে আগামী রবিবারের (৭ জুন) মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ময়নাতদন্ত না হলেও পার পাবে না অপরাধীরা
ঘটনার পর মৃত এক নবজাতকের স্বজন রমনা থানায় মামলা করলেও আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শিশুরা মরদেহ নিয়ে যান। আসামিরা এটিকে আইনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, "এটি রাতের আঁধারে ঘটা কোনো গোপন ঘটনা নয়, এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিজ্ঞ আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবেন না।"
হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে নতুন কড়াকড়ি
বেসরকারি হাসপাতালের লাগামহীন অব্যবস্থাপনা রোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এখন থেকে নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ও ভবন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করার কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। ভবিষ্যতে আর কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যাতে এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সেজন্য জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের নিয়ে নিয়মিত তদারকি এবং আকস্মিক পরিদর্শন জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।