নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। তিব্বতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে চীন। দুই দেশের এ দুর্যোগে দেড় হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
এর মধ্যেই বন্যার উজানে নতুন তৈরি হওয়া ও উপচে পড়া একটি হ্রদ থেকে আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ।
বুধবারের ওই ভয়াবহ দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারে আজ শুক্রবারও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
নেপাল পুলিশ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৯০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। আজ তা বেড়ে ইতোমধ্যে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর যে তথ্য চীন জানিয়েছিল, তা এখন পর্যন্ত অপরিবর্তিত রয়েছে।
নতুন হ্রদ থেকে ফের বন্যার শঙ্কা
বুধবারের দুর্যোগের পর উজানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জারি করেছে। হ্রদটি ইতোমধ্যে উপচে পড়ছে বলে জানিয়ে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানায়, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এতে জমা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি শুক্রবার সকালে জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গিরং বন্দরের প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ অবস্থিত। কাদা ও বন্যার পানিতে গিরং বন্দরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সিসিটিভির তথ্যমতে, হ্রদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৯৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, যা গিরং বন্দরের চেয়ে প্রায় ১ হাজার মিটার উঁচুতে।
সম্ভাব্য নতুন বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় নেপাল সেনাবাহিনী ভোতেকোশি নদীর পরিস্থিতি পরিদর্শনে সীমান্ত এলাকায় একটি দল পাঠিয়েছে।
হেলিকপ্টারে উদ্ধার তিন হাজারের বেশি মানুষ
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জানিয়েছে, দুর্গত এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে ৩ হাজার ২৫৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও আহতদের কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন যাদের অনেকেই ট্রেকার ও তীর্থযাত্রী।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, সীমান্তবর্তী আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে মানুষ আটকা পড়ার খবর পাওয়ার পর শুক্রবার সেখানে একটি দল মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু কাদায় ঢেকে যাওয়ায় টানেলটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ খুঁজে বের করা জটিল হয়ে পড়েছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা।’
দুর্যোগের বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল বন্যার স্রোত ভবন, সেতু ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ দৌড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। বন্যার পর বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন কাদায় ঢেকে গেছে। ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, ভবন কাদায় ঢেকে গেছে এবং অনেক সড়ক মাটিচাপা পড়েছে।
‘এটা বন্যা নয়, যেন সুনামি’
চীন সীমান্তের সবচেয়ে কাছের নেপালি গ্রাম টিমুরের বেঁচে যাওয়া বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তা করবির গাইরে।
তিনি বুধবার সকাল ৮টার দিকে অফিসে পৌঁছে কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। এ সময় প্রথমে তিনি ভূকম্পন অনুভব করেন।
গাইরে বলেন, ‘কম্পন অনুভব করার পরপরই দেখলাম আমাদের দিকে একটি কালো ঝড় ধেয়ে আসছে। আমরা সবাই সঙ্গে সঙ্গে বাইরে দৌড়াতে শুরু করি এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফিস ভবনের বিপরীত পাশের উঁচু জায়গায় উঠে যাই। আমার মনে হয়, ওই ১০ সেকেন্ডের মতো সময় আমাদের কয়েকজনের জীবন বাঁচিয়েছে।’
দুর্যোগের সময় অফিসে ঠিক কতজন ছিলেন, তা মনে করতে পারেন না গাইরে। তবে তার ১৫ সহকর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এটা যেন হলিউডের কোনো সিনেমার দৃশ্য ছিল। আমি একে বন্যা বলব না, এটা ছিল সুনামি।’
গাইরে জানান, সরকারি অফিস, হোটেল, ক্যাফে, ব্যাংক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, চায়ের দোকান ও আবাসিক ভবনে ভরা টিমুর ছিল একটি প্রাণবন্ত জনপদ। সেখানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিশ্বজুড়ে উৎকণ্ঠা
নিউইয়র্ক সিটির একটি রেস্তোরাঁর মালিক রাজন তামাং বলেন, কাঠমান্ডুতে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তার মা ও বোন মারা গেছেন। একই সঙ্গে তার আরও অনেক আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু এখনও নিখোঁজ।
নিউইয়র্কে এক শোক সমাবেশের পর তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা তখন ঘুম থেকে উঠছিলেন। তারা কোনো তথ্যও পায়নি, হঠাৎ করেই এই বন্যা চলে আসে। কেউ নিখোঁজ, কেউ প্রাণ হারিয়েছে এবং মাত্র কয়েকজন বেঁচে আছে।’
দক্ষিণ ভারতের পুদুচেরিতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিষ্ণুরাম রামাস্বামী জানান, তার মা ও দুই বোন কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। বুধবার সকাল ৯টায় তিনি সর্বশেষ তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মা বলেছিলেন, তারা সীমান্ত এলাকার দিকে যাচ্ছেন এবং হোটেলে পৌঁছে আমাদের ফোন করবেন। এটাই ছিল আমাদের শেষ কথা। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
রামাস্বামী বলেন, পরিবারের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে তিনি নেপাল ও ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাদের সফরের আয়োজনকারী ভ্রমণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাননি।
নিখোঁজদের অনেকে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় থাকতে পারেন। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাস একটি পবিত্র স্থান।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু জগ্গি বাসুদেব, যিনি সদগুরু নামেও পরিচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, একটি তীর্থযাত্রী দলের ৭৭ সদস্য সীমান্তের অভিবাসন কার্যালয়ে বন্যার মধ্যে আটকা পড়েছিলেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
উপগ্রহচিত্র নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে একটি হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের একটি অংশ ধসে পড়েছিল। এর সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশও নিচে নেমে আসে।
শিলা ও গলিত পানি নিচের উপত্যকার নদীগুলোকে ফুলিয়ে তোলে। এরপর সৃষ্ট প্রবল পানির স্রোত ভাটি অঞ্চলের ভবন, সেতু ও মাটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বন্যার দৃশ্যকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে বলেন, শক্তিশালী ও মজবুত ভবনগুলোও ‘কাঠির মতো’ ভেসে গেছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নেপালের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।