নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর:
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন না হতেই, গলাকাটা অবস্থায় মুখলেসুর রহমান (৬০) নামের এক অটোরিকশা-চালকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা শান্তিপাড়া এলাকায় একটি বটগাছের নিচ থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মুখলেসুর রহমান গঙ্গাচড়া উপজেলার নবনীদাস গ্রামের মৃত হামিদুর রহমানের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শান্তিপাড়া এলাকার একটি নির্জন স্থানে বটগাছের নিচে মুখলেসুর রহমানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় এক যুবক চিৎকার শুরু করেন। পরে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ উদ্ধার করেন। তবে ঘটনাস্থলে নিহতের অটোরিকশাটি পাওয়া যায়নি। পুলিশ ধারণা করছে, অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের ভাতিজা আব্দুল কুদ্দুস জানান, মুখলেসুর গত ২০-২৫ বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের ধারণা।
এ বিষয়ে গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর সবুর জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এদিকে, রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিদের পক্ষে কোনো আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে আইনজীবী সমিতি ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা একটি নিকৃষ্টতম অপরাধ। আইনজীবী সমিতি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দুজনকে আটক করেছে এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লুণ্ঠিত গহনা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আইনজীবী সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এই হত্যা মামলার আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে সমিতি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এ সময় তিনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও নানা ধরনের গল্প না ছড়ানোর এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার না করার কঠোর আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, রংপুর আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতিব, জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাওছার আলীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
চার সদস্যের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই অটোরিকশা-চালক হত্যার এই ঘটনায় রংপুরের সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গজঘণ্টা এলাকায় মাদকের বিস্তার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বাড়ছে। তবে অটোরিকশা-চালক হত্যার সঙ্গে সরাসরি মাদকের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয় পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে পরপর কয়েকটি অপরাধমূলক ঘটনায় স্থানীয়রা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।