ছায়াঢাকা আলোয় পদচিহ্ন
- মাহাবুব রহমান বিপ্লব
বইমেলা শেষে সন্ধ্যা নামার ঠিক মুখটাতে ক্যাফের এক কোণে বসেছিল অয়ন। বাইরে ফাল্গুনের মিহি বাতাস, আর টেবিলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। আড্ডার মাঝখানে বন্ধুটি হুট করে টেবিলের ওপর একটা বই এনে রাখল—পদচিহ্ন। যৌথ সম্পাদনার কাব্যগ্রন্থ। অয়নের চোখ দুটো আটকে গেল বইটির পাতাগুলোতে। বহু বছর ধরে দৈনিক পত্রিকার পাতায় তার কত গল্প, কত প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে, কিন্তু জীবনের প্রথম এই কাব্যগ্রন্থের পৃষ্ঠাগুলো ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ শিহরিত করে তুলল তাকে। প্রতিটি কবিতার লাইনে যেন লুকিয়ে আছে জীবনের কত না বলা অনুভূতি, প্রেম আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
অয়ন হঠাৎ করেই স্মৃতির গভীরে তলিয়ে গেল। সময়ের ঘড়িটা উল্টো ঘুরতে লাগল কয়েক দশক আগে।
তখন সে সবে কৈশোর পার হওয়া এক তরুণ। স্কাউটিংয়ের কঠোর শৃঙ্খলা আর বিকেলে ফুটবল মাঠ কাঁপানো চপলতায় যার দিন কাটত। ফুটবলের মাঠ থেকেই অয়নের ভেতরে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের হার না মানা মানসিকতা। কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে সর্বদা বাস করত এক সংবেদনশীল সত্তা। নবম শ্রেণীতে পড়তেই তার হাতে উঠে এসেছিল কলম; শিশু সাংবাদিক হিসেবে সত্য ও সুন্দরকে মানুষের সামনে তুলে ধরার যে নেশা শুরু হয়েছিল, তা আর কোনোদিন কমেনি।
কলেজের আঙিনায় পা দেয়ার পর থেকেই অয়নের জীবন এক ভিন্ন রূপ নেয়। ১৯৯১ সাল। ক্যাম্পাসজুড়ে তখন উত্তাল ছাত্ররাজনীতি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অয়নের সোচ্চার কণ্ঠ আর সুদর্শন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপ ক্যাম্পাসের তরুণ-তরুণীদের মনে এক আলাদা আল্পনা এঁকে দিত। কিন্তু রাজনীতিতে এসেও অয়ন ভুলে যায়নি তার আদর্শ। ক্ষমতার লোভে কিংবা সস্তার তোষামোদে সে কখনো নিজের মাথা নত করেনি। তার এই স্বাধীনচেতা স্বভাব ও নেতৃত্বের প্রতি মুগ্ধ হয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ৯৩ এবং ৯৪ সালে পর পর দু’বার তাকে ছাত্র সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচন করে।
সেই উত্তাল দিনগুলোতেই অয়নের জীবনে আগমন ঘটেছিল প্রথম ভালোবাসায়। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, মিছিলের স্লোগান আর রাজপথের সভার মাঝেই এক মিষ্টি বিকেল এনে দিয়েছিল রোমান্টিকতার সেই সোনালী পরশ। প্রথম স্ত্রীর সেই স্নিগ্ধ সান্নিধ্য, প্রেম আর ভালোবাসা অয়নের ভীষণ ব্যস্ত জীবনে নিয়ে এসেছিল এক পরম শান্তির নীড়। তাদের ঘর আলো করে একে একে এল এক পুত্র আর দুই কন্যা সন্তান। ছোট ঘরটি ভরিয়ে তুলল অফুরন্ত হাসি আর কলকাকলিতে।
তবে জীবন তো আর সবসময় একরৈখিক সরলরেখা নয়। সময় ও পরিস্থিতির টানাপোড়েনে অয়নের জীবনে আসে দ্বিতীয় অধ্যায়। দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ জীবনে তাদের কোল আলো করে আসে দুটি পুত্রসন্তান। প্রতিটি সন্তানের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে অয়ন ভালোবাসার নতুন নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে জীবনে কিছু পথচলা সংক্ষিপ্ত হয়েছিল; দু-তিন মাসের সেই স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়গুলো দ্রুতই সমাপ্তি পেয়েছিল এবং তারা নিজ নিজ নতুন গন্তব্যে থিতু হয়েছিল। কিন্তু অয়নের হৃদয়ে প্রতিটি মানুষের প্রতি ছিল সম্মান ও শ্রদ্ধা।
সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক জীবনের মেঠোপথে হেঁটে অয়ন কখনো প্রভাবশালী নেতা কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে নিজের ধর্ণা দেয়নি। দালালি আর তোষামোদকে সে ঘৃণা করত অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। ফলে অসাধু কিছু মানুষ আর শোষকদের চোখের কাঁটা হয়ে উঠেছিল সে। তার ওপর নেমে এসেছিল একের পর এক ষড়যন্ত্রমূলক মামলার খড়্গ। রাজপথের প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে একাধিক মামলায় জড়ানো হলেও আদালতের প্রতিটি রায়ে সে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পায়। অয়ন জানত, যে সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সত্যই তাকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে।
বিপদের দিনে অয়ন কোনো ক্ষমতাধর বা কোনো মাকলুকাতের দুয়ারে মাথা নত করেনি। সে কেবল হাত তুলেছে মহান আল্লাহর দরবারে। সব সংকটে, সব ঝড়ে স্রষ্টার ওপর এই অগাধ বিশ্বাসই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
আজ এত বছর পর, পেছনের অতীতে তাকালে অয়ন দেখতে পায় নিজের হাত ধরে তৈরি হওয়া এক ঝাঁক উজ্জ্বল তরুণ সাংবাদিককে, যারা সমাজে সত্যের আলো ছড়াচ্ছে। সে দেখতে পায় তার পাঁচ সন্তানের উজ্জ্বল চোখ, ভালোবাসায় ঘেরা পরিজন এবং সম্মান ও প্রাচুর্যে ভরা এক শান্তিময় জীবন।
ক্যাফের জানালায় হঠাৎ বৃষ্টি নামার আভাস। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে অয়ন ‘পদচিহ্ন’ কাব্যগ্রন্থটি হাতে নিল। জীবনের এত ঝড়, রাজনৈতিক ওঠানামা, সম্পর্কের জটিলতা আর ভালোবাসার নানা রঙের মাঝেও যে প্রেম আর আদর্শ বেঁচে থাকে—আজকের এই কাব্যগ্রন্থটি যেন তারই এক অমর দলিল। অন্যায়কে তুচ্ছ করে, প্রেম ও সত্যকে বুকে জড়িয়ে জীবনটা সত্যিই কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছেন ওপরওয়ালা! অয়ন মুচকি হেসে বইয়ের পাতায় হাত বোলালো, কারণ সে জানে, তার এই পথচলার প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি চিরন্তন পদচিহ্ন।
সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক ও কবি