
নিজস্ব প্রতিবেদক:
উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তার ভাঙনে লালমনিরহাট, রংপুর ও নীলফামারী জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় চোখের সামনে বসতভিটা ও ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদীপারের হাজারও মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের স্পষ্ট দাবি—তারা কোনো ত্রাণ চান না, তিস্তার ভাঙন থেকে বাঁচতে চান স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।
তিন জেলায় তীব্র ভাঙন ও ক্ষয়ক্ষতি:
লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলাতেই তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় জানান, কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ী ভাঙন রোধে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খুলিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাদল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আগ্রাসী তিস্তার ভাঙন কোনোভাবেই থামছে না। এলাকাবাসী মানববন্ধন করে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
একই চিত্র রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলায়। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন জানান, কেবল গত সাত দিনেই এই তিন উপজেলার ৫৩টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন:
সরেজমিনে নীলফামারীর ভাঙনকবলিত এলাকায় দেখা যায়, শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। রান্নাবান্না ও খাবারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কেউ কেউ উঁচু বাঁধ বা স্বজনদের আঙিনায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জরুরি ভিত্তিতে তাদের জন্য তাঁবু ও শুকনা খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন।
চর খরিবাড়ির বাসিন্দা আব্দুল করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গায় কোনোমতে মাথা গুঁজেছিলাম, রাক্ষসী তিস্তা সেটাও কেড়ে নিল। চোখের সামনে ঘর দুটো নদীতে চলে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।’
স্থানীয় বাসিন্দা আতোয়ার রহমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করলেই কেবল তাদের ঘুম ভাঙে, ভাঙন থামলে আবার তারা ঘুমিয়ে পড়েন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অবহেলার কারণে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস:
তিস্তার এই আগ্রাসী রূপ প্রসঙ্গে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনোভাবেই এই ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। যত দ্রুত সম্ভব ২০২৭ সালের শুরুতেই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে চাই। অন্যথায় এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কোনোভাবেই লাঘব হবে না।”