
কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি:
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বাড়ার পর তা কমতে শুরু করেছে। তবে পানি কমলেও স্বস্তি ফেরেনি তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে। উল্টো পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে নদী হয়ে উঠেছে আরও হিংস্র। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের চর ঢুষমারা এলাকায় গত এক সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে চর ঢুষমারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক বুক ফাটানো আর্তনাদ। কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল সারি সারি বসতবাড়ি, সাজানো উঠান আর সবুজ ফসলের জমি, সেখানে এখন শুধু তিস্তার উত্তাল স্রোত। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে যেতে দেখছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের হাত থেকে শেষ রক্ষা পেতে কেউ ঘরের টিন খুলে নিচ্ছেন, কেউ বাঁশ-খুটি সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউবা চেষ্টা করছেন সংসারের সামান্য জিনিসপত্রটুকু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানি কমার পর থেকেই ভাঙনের গতি কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও গাছপালা। ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কিংবা রাস্তার পাশে অস্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার চেষ্টা করছেন।
শুধু মানুষের বসতভিটাই নয়, তিস্তার এই তীব্র ভাঙনের মুখে রয়েছে চর ঢুষমারা জামে মসজিদ, ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদরাসা এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে নদীর একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে সোলেমান, সুফিয়ান, সাবিল্লা বেগম ও রশিদ মিয়ার ঘর। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নিলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
চর ঢুষমারা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “তিস্তার ভাঙন আগেও দেখেছি আমরা, কিন্তু এবার যেভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে এত মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেল, এমন দৃশ্য আগে দেখিনি।” একই গ্রামের সর্বস্ব হারানো বাদশা মিয়া বলেন, “পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিলীন হয়ে যাবে পুরো চর ঢুষমারা।”
ত্রাণের চেয়ে নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানই এখন তিস্তাপাড়ের মানুষের মূল দাবি। স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না, চাই নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই দুর্ভোগ শেষ হবে না।” একই দাবি জানিয়ে আবেদ আলী বলেন, “নির্বাচনের আগে সবাই বড় বড় কথা বলে, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। প্রতি বছর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা ক্লান্ত।”
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেজবাহুল রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ইতিমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, যাতে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছানো যায়।
অন্যদিকে, চর ঢুষমারা এলাকার ভাঙনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।