
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
রাজনীতিতে সংঘাত ও রক্তপাত পরিহার করে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা এবং আলোচনার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং এর জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বড় মাঠে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম নিজ জেলা সফর। স্থানীয় নাগরিক কমিটি ও সুধীসমাজ এ সংবর্ধনার আয়োজন করে।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতেই তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং আস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, শিক্ষকরা তাকে সততা ও নেতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বরাবরই শান্তিপ্রিয় এবং কোনো ধরনের ঝামেলা তারা পছন্দ করে না। এই harmonious পরিবেশ বজায় রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা আর কোনো সংঘাত বা রক্তপাত দেখতে চাই না। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সহিষ্ণুতা। আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে।” এছাড়া হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ যেন সমান অধিকার নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান:
জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়েছে। ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং উপাচার্যও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আগামীকাল (সোমবার) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এছাড়া জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে এবং আগামী বছর থেকেই সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। স্থানীয় জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে দুটি নতুন উপজেলা গঠন করা হয়েছে এবং সেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলায় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রস্তাবিত বিমানবন্দর চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। তবে এটি টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়তে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এমনকি চীন থেকেও বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীদের ঠাকুরগাঁওয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ১০ হাজার মানুষকে বিদেশে পাঠানোর একটি উদ্যোগের আওতায় ঠাকুরগাঁওয়ের যুবসমাজকেও সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। পাশাপাশি, শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির ওপর নির্ভর না করে যুবসমাজকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। নারীদের আরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার তাগিদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সমাজ গঠনে নারী সমাজের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান:
তরুণ সমাজকে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওকে একটি মাদকমুক্ত ও আদর্শ এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি।
নাগরিক সংবর্ধনা কমিষ্ঠার আয়োজনে অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দুপুরে হেলিকপ্টারে করে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছালে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে তিনি শহরসংলগ্ন সেনুয়া কবরস্থানে গিয়ে তাঁর বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন।