
ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইকসহ আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানকে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু (সংরক্ষিত নারী আসন-৪) কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেওয়া নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এ কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তুলনামূলক কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধার কারণে গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও এ ধরনের তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান শহর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, এ খাত চালক, মালিক, গ্যারেজ মালিক ও শ্রমিক, ব্যাটারি ও খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, চার্জিং সেবা প্রদানকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান নেটওয়ার্কও তৈরি করেছে।
তবে এ খাতের দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশদূষণ, জনস্বাস্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক যানবাহন একই সময়ে চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
মন্ত্রী এসব যানবাহনে ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি অনিরাপদভাবে ব্যবহার এবং নিয়ম না মেনে পুনর্ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। অন্যদিকে শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি। তিনি বলেন, এর ফলে অনুমোদনহীনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
নিবন্ধনহীন যানবাহন, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দুর্বল ব্রেক ও আলোকব্যবস্থা, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত ও ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশা।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে পরিচালিত রিকশার গ্যারেজের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) যৌথ অভিযানও পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অটোরিকশাকে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে অনুমোদিত ও বৈধ অটোরিকশাকে নম্বর প্লেট দেওয়ার মাধ্যমে লাইসেন্সিং ব্যবস্থার আওতায় আনা, কিউআর কোডের মাধ্যমে চালকদের নিবন্ধন শনাক্ত করা এবং ধাপে ধাপে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য নির্দেশনার আলোকে অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া, রুট নির্ধারণ, চালক ও তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ করা হবে। এসব পদক্ষেপ রাজধানীর যানজট কমাতে, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে বলে জানান তিনি।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে রাজধানীর ১৭টি ট্রাফিক সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা চালু রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে এসব ক্যামেরা ইতিবাচক ফল দিয়েছে। রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের আওতায় আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও ধীরে ধীরে আরও এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
রেহানা আক্তার রানু তার নোটিশে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর, বিশেষ করে রাজধানীর সড়কে ধীরে ধীরে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। লাল বাতি অমান্য করা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লেন পরিবর্তন ও গতিসীমা অতিক্রমের মতো আইন লঙ্ঘনের ঘটনা কমেছে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো এখনও নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, এসব যানবাহনে নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরা সেগুলো শনাক্ত করতে পারলেও জরিমানা করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, এসব বেপরোয়া যান নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। অন্তত প্রধান সড়কগুলো থেকে এসব রিকশা সরিয়ে নিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অটোরিকশার নকশার ত্রুটি দূর করে নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও লাইসেন্স দেওয়াসহ সবকিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।
বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এ খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না করে সরকারকে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলেও মনে করেন রানু। তিনি বলেন, জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাদের যানবাহন জব্দ করে ফেলে দেওয়া এবং পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা ঠিক নয়।
জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারকেও শর্ত হিসেবে রাখা হবে এবং নিবন্ধন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সংযোগ নিয়ে অবৈধ চার্জিং স্টেশন পরিচালনার কারণে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে দুর্নীতিও জড়িত। যারা এসব অবৈধ চার্জিং কার্যক্রম পরিচালনা ও ব্যবহার করছে, তাদের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত বলেও মন্ত্রী অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, বেকারত্ব যাতে না বাড়ে, কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে, যানবাহনে শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়—সরকার সব দিক বিবেচনায় রাখবে।