
স্টাফ রিপোর্টার রংপুর:
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
আজ রবিবার (৭ জুন) বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), রংপুর-এর উদ্যোগে এক মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন: এখনই সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপের।”
মানববন্ধনে টিআইবি কর্তৃক প্রকাশিত একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ বর্তমান হারের অর্ধেকে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা ‘নেট জিরো’ বা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সুশাসনের অভাব, নীতিগত অস্পষ্টতা, আইনি সীমাবদ্ধতা এবং খাতভিত্তিক অনিয়ম ও দুর্নীতি।
টিআইবি জানায়, বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত বিদ্যুতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বাংলাদেশে তা দীর্ঘ দিন ধরে মাত্র ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে। ২০২৫ সালে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করলেও বিশেষজ্ঞরা একে সময়োপযোগী ও সমন্বিত মনে করছেন না।
এই খাতের মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো:
ধারণাপত্র অনুযায়ী, পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের আইনি কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। ২০২৪ সালের পরিবেশ সুরক্ষা দক্ষতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম, যেখানে ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ২৮.১।
সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে পরিবেশ আদালত আইন ২০১০-এ। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ভুক্তভোগী নাগরিক সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। মামলা করতে হলে প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত রিপোর্টের প্রয়োজন হয়, যা বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত মাত্র দুটি পরিবেশ আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর আওতায় মাত্র ৫৯২টি মামলা হয়েছে, যা সংঘটিত অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আইনের এই দুর্বলতার সুযোগে নদী-খাল-জলাভূমি দখল, পাহাড় কর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্লাস্টিক ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য দূষণ অবাধে চলছে। শুধু বায়ুদূষণের কারণেই বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে প্রধান সুপারিশগুলো হলো:
১. জীবাশ্মভিত্তিক উৎস থেকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের জন্য একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট ও কর হ্রাস করা এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।
৩. পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ সংশোধন করে ভুক্তভোগী নাগরিক বা সংস্থাকে সরাসরি আদালতে মামলা করার সুযোগ দেওয়া।
৪. পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’-এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
৫. প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আইন ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনা।
পরিবেশ সুরক্ষায় কেবল দিবস উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশ আইনগুলোর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।