
রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় চাঞ্চল্যকর গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজন হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফল পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের শরীরে কোনো অবৈধ মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার ১০ দিন পর নমুনা সংগ্রহ করায় নমুনায় মাদকের অস্তিত্ব ধরা পড়েনি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা দাবি করেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তারা চরম উন্মাদনা ও মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন। এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আদালতের আদেশে গত ৩০ আগস্ট রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে আসামিদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করেন চিকিৎসকরা।
পরে হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উভয় আসামির শরীরে ইয়াবা, গাঁজা বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত মাদক সেবনের পর মানবদেহে বা প্রস্রাবে এর উপস্থিতি সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা থেকে চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ১০ দিন পর পরীক্ষা করায় স্বাভাবিকভাবেই শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, “কারাগার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ১০ দিনের মাথায় ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে। যারা মাদক সেবন করেন, তাদের প্রস্রাবে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আরও কম সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে ভালো হতো।”
তিনি আরও বলেন, “সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে তারা মাদকে আসক্ত কি না, তা স্পষ্ট বোঝা যেত। পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া যায়নি বলে তারা মাদকাসক্ত নন—এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আবার ১০ দিন পর পরীক্ষা করায় তারা ওই সময় মাদকাসক্ত ছিলেন না, সেটিও প্রমাণ করে না।”
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “এত বড় একটি ঘটনার এক-দুই দিন পরই ডোপ টেস্ট করা যেত। সেখানে ১০ দিন পর পরীক্ষা করে নেগেটিভ এসেছে। এখন ন্যায়বিচার কীভাবে পাব, সেটাই দেখার বিষয়।”
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী ডোপ টেস্টে ফলাফল নেগেটিভ আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়া গেলেও এতে খুনের তদন্তের অন্যান্য দিকগুলো প্রভাবিত হচ্ছে না। আসামিদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে মামলার তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী। শুনানির পর বিচারক আসামিদের দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন।