
খলিলুর রহমান খলিল, তারাগন্জ রংপুর:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে দেওয়া চালের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, এবার যে চাল বিতরণ করা হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের, এমনকি রান্নার কিছুক্ষণ পরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ডিলার ও খাদ্য বিভাগের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের চাল সরবরাহের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় তারাগঞ্জের পাঁচটি ইউনিয়নে ২১ জন ডিলারের মাধ্যমে ১০ হাজার ২২৬ জন সুবিধাভোগীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। প্রতি কেজি চালের দাম রাখা হয় ১৫ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী চাল বিতরণের সময় ব্যানার টাঙানো, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা এবং গুণগত মান তদারকির দায়িত্বে ট্যাগ অফিসাররা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মিলছে না।
সুবিধাভোগীদের ক্ষোভ ও অভিযোগ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) উপজেলার অন্তত সাতটি ডিলারের বিতরণকেন্দ্রে নিম্নমানের চাল বিতরণ এবং ছেঁড়া-ফাটা বস্তা ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়।
তারাগঞ্জের ইকরচালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের দিনমজুর আনছার আলী আক্ষেপ করে বলেন, “হামরা গরিব মানুষ। সরকার ১৫ টাকা কেজি দরে চাউল দেয়, যাতে হামরা খাবার পারি। এবার যে চাউল দিছে, তাও সাত মিশালি। সকালে ভাত রান্না করলে বিকালে আর থাকে না। পুষ্টি চালের কথা কইয়া অপুষ্টি চাল হামাক ডিলারেরা দিছে।”
আলমপুর ইউনিয়নের চকতাহিরা গ্রামের বাসিন্দা মজনু মিয়া বলেন, “আগের দিনের চালগুলো ভালোই ছিল। তবে এবার যে চাল দিছে তার মান খুবই খারাপ। লাল চালে একটা বাজে গন্ধ আসে, ভাত খাওয়া যায় না। রান্নার কিছুক্ষণ পরে নষ্ট হয়ে যায়। সরকার কম দামে ভালো চাল দিলেও ডিলারেরা উল্টো খারাপ ও পুরোনো চাল দিচ্ছে।”
তদারকিতে গাফিলতি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
চাল বিতরণের সময় তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সায়েম হাসান জানান, এক বছর আগে খাদ্য অফিস থেকে একবার চিঠি পেলেও এরপর আর তেমন খোঁজখবর রাখা হয়নি। মাঝেমধ্যে ডিলাররা ফোন করে চাল বিতরণের কথা জানান।
তারাগঞ্জ বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন আপান বলেন, “খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্নমানের চাল বিতরণে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট গাফিলতি রয়েছে। এই অনিয়মের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। খাদ্য গোডাউনের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই চাল সরবরাহ করা হয়েছে বলে মনে করছি। এর সঠিক তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
অভিযোগের বিষয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আব্দুস সামাদ দাবি করেন, সরকারি গুদাম থেকে যেভাবে চাল সরবরাহ করা হয়, তারা সেভাবেই কার্ডধারীদের মাঝে বিতরণ করেন। চালের গুণগত মান নির্ধারণে তাদের কোনো হাত নেই।
তবে নিম্নমানের চাল বিতরণ ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) জাহাঙ্গীর আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, জেলা কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না।
একইভাবে চাল বিতরণে আর্থিক লেনদেন ও চালের মান নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আফরোজা বেগমও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে লিখিত অনুমতি নেওয়ার কথা বলেন।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ছালেহ আজিজ বলেন, “আমাদের সংগ্রহের বাইরে থেকেও কিছু চাল আসে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ ও আর্থিক লেনদেনসহ সকল অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”